রবিবার, ১৬ মে ২০২১, ১২:০৯ অপরাহ্ন

ওমান প্রবাসী ছেলেকে বাড়ি নিতে নারাজ বাবা মা!

ওয়ালিদ ইসলাম, সহকারী সচিব, কল্যাণ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
    প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৯ মার্চ, ২০২১
ওমান প্রবাসী ছেলেকে বাড়ি নিতে নারাজ বাবা মা!
ছবিঃ প্রতীকী

ঘটনা- ১
অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেটা ওমান পাড়ি জমিয়েছিল বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। যে কদিন সুস্থ ছিলো পরিবারের এমন কোন আবদার নেই, যা সে পূর্ণ করেনি। হয়তো কখনো ফোনে মাকে জিজ্ঞেস করতো, মা তোমার কি লাগবে? বাবাকে হয়তো বলতো, বাবা তোমার এবারের ঈদে আমি এতো টাকা দেবো তুমি এটা-ওটা কিনো, বাড়িটা এবার পাকা করে ফেলো আমি টাকা পাঠাচ্ছি। হয়তো, কাজ সেরে এসে মায়ের কথা ভেবে কেঁদে বুক ভাসিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে আবারো কাজে চলে যেতো।

 

কতো স্বপ্ন দেখতো পরিবারকে নিয়ে! পরিবারের সবাই কতো আবদারই না করতো তার কাছে। কখনো ঈদে হয়তো আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে বাড়িতে বিরিয়ানি খাওয়ার গল্প শোনাতো মাকে। কিন্তু, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ছেলেটা ছাদ থেকে পড়ে কোন মতে বেচে আছে। ওমানে তার মালিক গত একবছর যাবত তার সকল চিকিৎসার দায়ভার নিয়েছে।

ছেলেটা এখন মৃত্যু পথযাত্রী। তার মালিকের কাছে আবদার করেছে যে, সে দেশে এসে মায়ের বুকে মরতে চায়। তার মালিক একটা এয়ার এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাকে দেশে পাঠাতে চায়। কিন্তু, তার দেয়া নম্বরে যোগাযোগ করে তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায় না। আসলে সে যেন যোগাযোগ করতে না পারে তাই বাবা-মা নম্বর পরিবর্তন করেছে।

অবশেষে তার পাসপোর্ট থেকে তার ঠিকানা বের করে অনেক কষ্টে তার পরিবারের নতুন ফোন নম্বর জোগাড় করলাম ডিসি অফিসের সহায়তায়। গত দেড় সপ্তাহ ধরে কল দিয়ে বারবার একই উত্তর পেলাম। তাও পেলাম তার মা-বাবার কাছ থেকে। উত্তরটি পেয়ে চোখে কান্না চলে এসেছিলো। আপনাদেরও আসবে।

উত্তরটি ছিলো, “ওইয়ে দ্যাশে আইনে আমরা কি করব? তার চে অরে ওইহেনে মরতি দেন। তালি আমরা গরীব মানুষ, সরকারের দিয়া ক্ষতিপূরনডা অন্তত পাবানি। মরারে দ্যাশে আইনে আমাগে সর্বনাশ করার দরকার কি আপনের? আর অরে এইহেনে দ্যাখপেনে কিডা?” মুখ ফুটে আর বলতে ইচ্ছে হলো না যে, সে দেশে এলে ওমান থেকে মোটা অঙ্কের একটা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে যা তাদের সংসারকে ধনী করতে যথেষ্ট।

 

ঘটনা-২
ব্রুনাই থেকে লাশ দেশে আনতে অথবা ওখানে দাফন করতে ইউএনও স্যারের একটা প্রত্যয়ন পত্র লাগবে। প্রতিদিন ইউএনও স্যারকে ফোন দিয়ে বার বার বলি স্যার একটু ফ্রি যদি থাকেন তার পরিবারের কাউকে পাঠাচ্ছি। গত ৪ দিন ধরে পরিবারকে দিনে ৭-৮ বার ফোন দিই। তারা বলে এখনই রওয়ানা দিচ্ছি। ইউএনও স্যারও তাদের জন্য অনর্থক কাজ ফেলে থাকেন অপেক্ষায়।

অথচ, দিন শেষে কল আসে, “আইজকে এট্টু ব্যস্ত ছিলামতো সার, তাই টিএনওর কাছে যাতি পারিনি।” পরে সরকারের দেয়া তিন লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের গল্প শুনালাম। এই রাতে তারা ইউএনও স্যারের অফিসের সামনে গিয়ে এখন বসে আছে। অথচ, কতো কষ্ট করে ছেলেটা তার বড়ভাইকে বাজারে দোকান করে দিয়েছিলো, বাবাকে কিনে দিয়েছিলো ক্ষেতের নতুন নতুন জমি। মায়ের জন্য বাসায় করে দিয়েছে বড় একটা মুরগির খামার। আজ তার লাশ ঝুলে আছে তার পরিবারের অনীহায়।

ঘটনা-৩
মেয়েটা জর্ডানে একটা বাসায় কাজ করতে করতে সিঁড়ি থেকে পড়ে মাজার হাড় ভেঙে ফেলেছে। তার মালিক তার হাতে ২ লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। টাকাটা তার ভাই নিয়ে জুয়া খেলে উড়িয়ে বোনকে নিয়ে বিক্রি করতে গিয়েছিলো কোন এক ব্রোথেলে (পতিতালয়)। হাটতে না পারায় দাম খুব ভালো দেয়নি সেখান থেকে। তার কষ্ট দেখে কেউ তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়ে এলো।

 

সে এটাও বললো তাকে নাকি আজীবন ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছিলো। ভয়-ভীতি রেখে এম্বাসেডর ম্যাডামকে ফোন দিলাম, তার সকল কাগজ-পত্র ম্যাডামকে পাঠালাম। ম্যাডাম নিজে তার মামলাটা নিজেই সমাধান করলেন। রায় এলো বেচে থাকা অবস্থায় প্রতিবছর তাকে তিন লাখ টাকা করে দেয়া হবে। এখন সে তার ভাই-ভাবীর চোখের মণি।

 

ঘটনা-৪
প্রবাসী স্বামী রেখে অন্য একজনের সাথে ভেগে গেছে ১১ বছর আগে। ১১ বছর ধরে স্বামীর কোন খোজ খবর নেয়নি। এই সংসারটা যখন ভেঙে গিয়েছে। এখন এসে আবেদন করে গত ১১ বছর ধরে তার স্বামী কোন ভরণপোষণ দেয়না। এখন তার মামাবাড়ির আবদার রক্ষা করে আমরা তার স্বামীকে যেন চাপ দিই।

আমার আসলে এভাবে লেখা উচিৎ ছিলোনা, তবুও লিখলাম। ঘটনাগুলো আসলে সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। অথচ, প্রতিদিন এরকম শত শত ঘটনার কয়েকটি উল্লেখ করলাম। মাঝে মাঝে তীব্র রাগ হয়, মাঝে মাঝে কান্না পায়, মাঝে মাঝে ভাবি এই হলো আমরা, এটা আমাদের জীবন, ওরা আমাদেরই পরিবারের কেউ।

আরো পড়ুনঃ

ভালো কাজের এই প্রতিদান!

ওমান রুটে বিমানের এ কি হাল!

ওমানে ছাদ থেকে পড়ে এক বাংলাদেশীর মৃত

পাসপোর্ট নিয়ে চরম ভোগান্তিতে ওমান প্রবাসীরা

ফেসবুক প্রতারণা থেকে প্রবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান

সৌদির নতুন শ্রম আইনে কতটা সুবিধা পাবেন বাংলাদেশিরা?

 

আর ওই সব প্রবাসীরাই আমাদের অর্থনীতির চাকাটা ঘুরিয়ে দিতে, পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে সব কষ্ট সহ্য করে অকাতরে কাজ করে যাচ্ছে। ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা সকল প্রবাসীদের প্রতি। তবে, আবেগ সামলাতে না পারা এই আমি রোজই এসকল ঘটনা শুনতে শুনতে ক্যামন যেন মাত্রাতিরিক্ত শক্ত হয়ে গিয়েছি।

লেখক: ওয়ালিদ ইসলাম, সহকারী সচিব, কল্যাণ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

 

আরো দেখুনঃ 

 

প্রবাস টাইম সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
রিলেটেড নিউজ
© 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি
Technical Support By NooR IT