প্রবাস টাইম
ঢাকাশনিবার , ৩১ অক্টোবর ২০২০
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ওমান
  5. করোনা আপডেট
  6. কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. খোলা কলম
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. জানা অজানা
  12. জীবনের গল্প
  13. ধর্ম
  14. প্রতিনিধি
  15. প্রবাস
প্রবাসীর ট্যাক্সি | Probashir Taxi
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ওমানের রহস্যময় নগরী সাদ্দাতের বেহেস্ত

প্রতিবেদক
ডেস্ক রিপোর্ট
অক্টোবর ৩১, ২০২০ ২:১৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ওমানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইরাম নগরী বা সাদ্দাতের বেহেস্ত। মরুভূমির ধুলিগর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক অভূতপূর্ব নগরী ইরাম, যাকে ডাকা হয় মরুর আটলান্টিস। কথিত আছে, শাদ্দাদ বিন আদ নামের এক ব্যক্তি ছিল এ শহরের রাজা, তার নির্দেশেই নির্মিত হয় তৎকালীন সময়ের দুনিয়ার জান্নাত বা ‘ভূস্বর্গ’। প্রবাস টাইমের আজকের প্রতিবেদনে জানাবো সেই ইরাম নগরীর অজানা ইতিহাস।

 

হারিয়ে যাওয়া এ শহরটি ‘উবার’(Ubar), ওয়াবার (Wabar) কিংবা ‘ইরাম’ (Iram) নামে পরিচিত। ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনেও স্থান পেয়েছে এই ইরাম শহরের ঘটনা। হারিয়ে যাওয়া এই শহরটি ছিল তখনকার সবচেয়ে চাকচিক্যময় ও আধুনিক শহর। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো বলছে, সেই শহরের মত শক্তিশালী বাড়ি-ঘর এর আগে কেউ কখনো দেখেনি বা নির্মাণ ও করেনি। শহরটি তৈরি হয়েছিলো উঁচু উঁচু পিলার দিয়ে, যা তখনকার দিনে ছিল কল্পনাতীত অবকাঠামো।

অবাক করা ব্যাপার, কেবল উপকথার পাতাতেই নয়, পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে এ নগরীর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, “তুমি কি ভেবে দেখনি তোমার প্রতিপালক আ’দ জাতির ইরামে কী করেছিলেন? তাদের ছিল সুউচ্চ সব স্তম্ভ, যেমনটি পৃথিবী কোনোদিন দেখেনি আগে।” (কুরআন, সুরা ফাজর, ৮৯:৬-৮)

এছাড়া এটি ছিল বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি। এখানে সুগন্ধি গাছ ‘ফ্রাঙ্কেনসেন্স’ এর চাষাবাদ হতো। কথিত আছে এ ‘ফ্রাঙ্কেনসেন্স’ নাকি সোনার চেয়েও দামি। তৎকালীন সময়ে সমুদ্রপথে জাহাজে করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এরকম সুগন্ধি গাছ আরবের আর কোথাও জন্মাতো না।

ইরাম নগরীতে প্রবেশের মুল ফটক এটা। ছবিঃ হাসান

১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে‘দ্য লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস’ পত্রিকায় জানানো হয় একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আবিষ্কার হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ নিকোলাস ক্লাপের উদ্যোগে প্রাচীন মানচিত্র ঘেঁটে এবং মার্কিন গবেষণা কেন্দ্র ‘নাসা’র  স্যাটেলাইটের সাহায্যে খুঁজে পাওয়া যায় ১২ মিটার বালির নিচে লুকিয়ে থাকা ‘ইরাম’ বা ‘উবার’ শহরকে।

আরো পড়ুনঃ রহস্যময় ওমানের সুলতান 

শহরটি ওমানের মাস্কাট থেকে ৯০০ কিমি দূরে শিসর এলাকায় অবস্থিত। যা ওমানের ধোফার প্রদেশের অন্তর্গত। উবার শহরটি ‘রুব-আল খালি’ মরুভূমির নিচে চাপা পরে আছে, যা ‘মরুভূমির জনশূন্য’ এলাকা বলে পরিচিত। কথিত আছে, হযরত নুহ (আঃ) এর পুত্র শামের ছেলেই আ’দ। তার পুত্র শাদ্দাদ আ’দ জাতির প্রতাপশালী রাজা ছিল, যার স্বপ্ন ছিল দুনিয়াতে স্বর্গ নির্মাণ করা। 

 

আ’দ জাতি একসময় একেশ্বেরবাদ বর্জন করে এবং মূর্তিপূজা শুরু করে, যেমন সামদ, সামুদ এবং হারা ছিল তাদের তিন উপাস্য। হুদ (আঃ) অনেক দিন তাদের মাঝে একেশ্বরবাদ প্রচার করেন, আল্লাহ্‌র পথে ডাকেন। কিন্তু তারা না ফেরায় এক ঝড় তাদের ধ্বংস করে দেয়, আর সকাল বেলা জনশূন্য ইরাম পড়ে থাকে। (কুরআন, ৪৬:২৪-২৫)

আজও রয়েছে সেই প্রাচীরের কিছু অংশ। ছবিঃ হাসান

উপকথা অনুযায়ী, নবী হুদ (আঃ) শাদ্দাদকে পরকালের বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু শাদ্দাদ বলল সে নিজে বেহেশত বানাবে দুনিয়াতেই, লাগবে না তার পরকালের বেহেশত। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়ে বেহেস্ত সম্পর্কে ধারণা নেয় সাদ্দাত। এরপর সাদ্দাতের ভাই শাদিদ মারা যাবার পর শাদ্দাদ বেহেশত বানাবার ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর তৎকালীন ইয়েমেনের আদানের কাছে এক বিশাল এলাকা জুড়ে শাদ্দাদের ‘বেহেশত’ নির্মাণ শুরু হয়। প্রাচীর দেয়ালগুলো ৭৫০ ফুট উঁচু ছিল, আর প্রস্থে ৩০ ফুট। চারদিকে চারটি ফটক। ভেতরে তিন লক্ষ প্রাসাদবাড়ির কথা বর্ণিত আছে, উপকথা অনুযায়ী যার নির্মাণ কাজ শেষ হয় ৫০০ বছরে। 

 

সাদ্দাতের বাবার নাম ছিলো আ’দ, যিনি তৎকালীন সময়ের রাজা ছিলেন, আ’দের মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে শাদিদ রাজা হয়, ৭০০ বছর পর্যন্ত চলে তার রাজত্ব। খুবই কড়া এবং ন্যায় ছিল তার শাসন। সাদ্দাতের বড়ভাই সাদিদ ন্যায় শাসক থাকলেও সাদ্দাত ছিলো ভিন্ন। তার বড়ভাই সাদিদের মৃত্যুর পর উজির শাদ্দাদ রাজা হয়। রাজা হবার পর তার কাছে হুদ (আঃ) গিয়ে বেহেশতের কথা বলেন। তখন শাদ্দাদ বললো, “তোমার প্রতিপালকের বেহেশতের কোনো দরকার আমার নেই। এরকম একটি বেহেশত আমি নিজেই বানিয়ে নেব।”

এই সেই রহস্যময় প্রবেশ পথ। ছবিঃ হাসান

শাদ্দাদ তার ভাগ্নে জোহাক তাজীর কাছে দূত পাঠাল, জোহাক তখন পাশের এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা। দূত মারফত শাদ্দাদ বললো, “ভাগ্নে! তোমার রাজ্যে যত সোনারূপা আর মূল্যবান জহরত আছে, সব সংগ্রহ করে আমার দরবারে পাঠিয়ে দেবে, যত মেশক আম্বর আর জাফরানাদি আছে সেগুলোও। আমি দুনিয়ায় এক বিশাল অনুপম বেহেশত তৈরি করতে চাই।”

 

আশপাশের অনুগত রাজাদেরও শাদ্দাদ একই নির্দেশ দিল। আর নিজের সকল প্রজার ক্ষেত্রেও একই নির্দেশ ছিল, কারো কাছে কোনো জহরত পাওয়া গেলে তার ভাগ্যে আছে কঠিন শাস্তি। তল্লাশিও চলত নিয়মিত। একে একে জহরতে ভরে যেতে লাগলো শাদ্দাদের দরবার। দেশ-বিদেশ থেকে আসা তিন হাজার সুদক্ষ কারিগর কাজ শুরু করল।

 

বেহেশত বানাবার কাজ চলছে পুরোদমে। চল্লিশ গজ নিচ থেকে মর্মর পাথর দিয়ে বেহেশতের প্রাসাদের ভিত্তি স্থাপন করা হলো। আর তার উপর সোনা-রুপানির্মিত ইট দিয়ে প্রাচীর বানানো হলো। বর্ণিত আছে, কৃত্রিম গাছও শাদ্দাদ বানায়, যার শাখা প্রশাখাগুলো ছিল ইয়াকুত পাথরের, আর পাতাগুলো নির্মিত হয়েছিল ‘ছঙ্গে-জবরজদ’ দিয়ে। আর ফল হিসেবে ঝুলছিল মণি মুক্তা আর হীরা জহরত। আর মেঝে ছিল চুন্নি পান্নার মতো মূল্যবান পাথরের, সাথে মেশকের ঘ্রাণ। স্থানে স্থানে ঝর্নাধারা ছিল দুধ, মদ আর মধুর। আর চেয়ার টেবিল ছিল লক্ষাধিক, সবই সোনার তৈরি। মোটকথা, এলাহি কাণ্ড, মনোহরী এক দৃশ্য।

নির্মাণকাজ শেষ হলে সে বেহেশতের ফটক দিয়ে ঢুকবার জন্য হাজার হাজার সেনা নিয়ে অগ্রসর হলো শাদ্দাদ। তিন হাজার গজ দূরে এসে তার বাহিনী অবস্থান নিল। এমন সময় অদ্ভুত এক হরিণের দিকে তার নজর পড়ল। দেখে মনে হচ্ছিল, হরিণের পাগুলো রূপার, শিং সোনার আর চোখে ইয়াকুত পাথরের। শাদ্দাদের শিকারের নেশা ছিল। বাহিনীকে থামতে বলে নিজেই রওনা দিল হরিণটি ধরার জন্য। কিন্তু হরিণের দেখা আর মেলেনি। এক বিকট অশ্বারোহী তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো, যেই না শাদ্দাদ তার বাহিনীর কাছ থেকে সরে এলো। অশ্বারোহী বললেন, “এই সুরম্য প্রাসাদ কি তোমাকে নিরাপদ রাখবে?”

একটি পাথরের নিচে চাপা পরে আছে সেই রহস্যময় সাদ্দাতের বেহেস্ত। ছবিঃ হাসান

শাদ্দাদ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল, তার স্বপ্ন পূরণ না করেই চলে যেতে হবে? শাদ্দাদ এক পা মাটিতে রাখতে গেলো। কিন্তু সেটি মাটি স্পর্শ করার আগেই আযরাঈল (আঃ) দেহপিঞ্জর থেকে আত্মা বের করে নিলেন। আর জিব্রাঈল (আঃ) এর প্রকাণ্ড এক শব্দ করলেন যাতে মারা গেল উপস্থিত সেনাবাহিনী। আর অসংখ্য ফেরেশতা এসে ধ্বংস করে দিয়ে গেল দুনিয়ার ‘বেহেশত’, পরে রইল ধ্বংসস্তূপ।

 

তবে কিংবদন্তী হয়ে দাঁড়ায় স্থলভূমির রাস্তা ‘দ্য ইনসেন্স রোড’। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো থেকে রাস্তাটার অস্তিত্বের প্রমাণ আজও পাওয়া যায়। সহস্র পিলারের শহরটার গোড়াপত্তন করেছিল নূহ (আঃ) এর বংশধরেরা। মরুভূমির কাফেলাগুলোকে পানি সরবরাহ করে ধনী হয়ে উঠেছিল শহরটি। পানির সেই কূপটিও এখন বিশাল এক পাথরচাপায় পরে আছে। পাথরের একদিকে বর্তমানে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে ভিতরে নামলেই এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখা মেলে। অন্ধকার আর পোকা-মাকড়ের শব্দ। রয়েছে অক্সিজেনেরও ঘাটতি।  

 

আজও একটা সিঁড়ি রয়েছে নিচে নামার, কিন্তু কেউ নামতে সাহস পায়নি। সিঁড়ির পাশে গেলেই মারাত্নক দুর্গন্ধ আর পোকা-মাকড়ের বিকট শব্দে ভেতরে যাবার সাহস হারিয়ে ফেলে সবাই। এভাবেই আদ সম্প্রদায় ও তাদের শহর উবার বা ইরাম শহর বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং চিরতরে বালিতে চাপা পরে সাদ্দাতের সেই কথিত জান্নাত। 

বিস্তারিত দেখুন প্রতিবেদনেঃ

প্রবাস টাইম সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।